হোমপেজ
মৃত্যুঞ্জয়ী ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী
অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ
2017-01-17
178
১৯৫৮ সাল। জুন মাস। বহতা ইছামতির স্রোতধারা উজিয়ে একটি জাহাজে এলেন প্রদেশমন্ত্রী। একহারা চৌকস চেহারা। চারদিকে জয়ধ্বনি। বেড়া বিপিন বিহারী হাইস্কুল পরিদর্শনে এসেছেন। জেলার নামকরা স্কুল। ফুল ছিটিয়ে কাগজের মালা বানিয়ে তাকে বরণ করলাম। বলছি এম মনসুর আলীর কথা। তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। স্কুলের ক্যাপ্টেন। হেডমাস্টার ছিলেন শচীন্দ্র নাথ ভৌমিক। স্কুল কমিটির পক্ষ থেকে তাকে স্বাগত জানানো হয়। এম মনসুর আলী শিক্ষার কথা, কৃষকের পাটের মূল্য, সর্বোপরি সুশিক্ষার কথা বলেছিলেন। তিনি নিজে ছিলেন মেধাবী। সব পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে, এমনকি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি প্রথম শ্রেণিতে এমএ পাস করেন।

নীতি, আদর্শের প্রতি ও নেতার প্রতি ছিল অকুণ্ঠ আনুগত্য। প্রথমে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা আন্দোলন, পাবনায় ভুট্টো আন্দোলন ও ৬ দফা আন্দোলনে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী, '৫৬ সালে প্রদেশমন্ত্রী হন। '৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খাদ্য, কৃষি, বাণিজ্য, শ্রম, শিক্ষা ও আইন সংসদ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। বেড়া-বগুড়া মহাসড়ক তার পরিকল্পনা এবং প্রচেষ্টায় গৃহীত। রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ ঋদ্ধ মানুষটি নিরহঙ্কার, অমায়িক। দিলখোলা শিশুর মতো। কিন্তু কর্তব্যকর্মে কঠোর। প্রতিজ্ঞায় ও প্রত্যয়ে অনড়। মহত্ত্বের বিশালতায় ও আদর্শের শানিত চেতনায় সদা উজ্জীবিত মানুষটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিক জাতীয় নেতৃত্বের পুরোভাগে চলেছেন বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে।

স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এম মনসুর আলীও আটক হন। '৬৯-এর গণআন্দোলনে মুক্ত হন। গ্রামগঞ্জে ৬ দফা প্রচারে তিনি ছিলেন ক্লান্তিহীন চারণ রাজনীতিবিদ। মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে কাছ থেকে আমি তাকে দেখেছি সংকটের ঘূর্ণাবর্তের মধ্যেও নিস্তরঙ্গ। শুক্রাবাদে এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতেন। প্রায়ই যেতাম। ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি। বলতে গেলে এপার, ওপার। অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে বলতেন, পাকিস্তান টিকবে না। যে পাকিস্তান অর্জনের জন্য কাজ করেছি হোমগার্ডের, হয়েছিলাম ক্যাপ্টেন; এখন সেই পাকিস্তানকেই কবর দিতে হচ্ছে। ওরা ৬ দফা মানবে না। আমরাও থাকব না। বাংলাদেশ স্বাধীন হবে।

১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল বগুড়া থেকে ট্রাকে অস্ত্র নিয়ে পাবনার পথে আসছিলাম। চান্দাইকোনার কাছাকাছি দেখি একটি খোলা জিপ আসছে। আমার সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র হাতে গাড়িটির দিকে তাক করে। জিপ থেকে নেমে দেখতে পাই জিপে উড়ছে স্বাধীন বাংলার পতাকা। জিপে বসে আছেন আমাদের প্রিয় নেতা এম মনসুর আলী। মনসুর ভাই আমাকে বললেন, সাইয়িদ আমার সঙ্গে আসো। ওই জিপে বগুড়ায় গিয়ে ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়। গাজী ভাই বললেন, গতকাল বগুড়া হয়ে এএইচএম কামারুজ্জামান, শেখ ফজলুল হক মনি এবং তোফায়েল আহমেদ চলে গেছেন ভারতে। সন্ধ্যার পর মনসুর ভাইয়ের সঙ্গে জয়পুরহাটের দিকে রওনা দিই। গাজীউল হক সাহেব বর্ডারের বিএসএফের কর্নেল মুখার্জিকে একটি চিরকুট লিখে দেন, যাতে আমরা নিরাপদে কোলকাতায় যেতে পারি। এ সময় হিলি বর্ডার ছিল মুক্ত। হিলি রেলস্টেশনে আমাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যে বিএসএফের কর্মকর্তা এসে এম মনসুর আলীকে স্যালুট দিয়ে সঙ্গে নিয়ে যান। তিনি বলেলেন, তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। বললাম, আমার ছেলেরা এলাকায় যুদ্ধরত। পাবনা-বেড়া মুক্ত। মনসুর ভাই বললেন, বড় যুদ্ধ সামনে। চলো আমার সঙ্গে। তারপর ট্রেনে মনসুর আলী সাহেব, ড. মফিজ ও আমি একসঙ্গে কোলকাতায় আসি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরকার গঠনের প্রশ্নে তিক্ত ও বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সংসদীয় দলনেতা হিসেবে প্রস্তাবিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর স্বাভাবিক দাবিদার ছিলেন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চল থেকে ওই সময় আগত কিছু আওয়ামী লীগ নেতা ও পরিষদ সদস্যদের মধ্যে এ কথাও জোরেশোরে বলাবলি হচ্ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে এএইচএম কামারুজ্জামান হবেন প্রধানমন্ত্রী। কেননা তিনি পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। অন্যদিকে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তথাপি এমনিতেই রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল যে, তাজউদ্দীন দিল্লিতে নিজেকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং সেই সুবাদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে 'হাইকমান্ড' নামে পরিচিত সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খন্দকার মোশতাক আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানের সঙ্গে আলোচনা না করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দিল্লিতে কমান্ডের অন্তর্ভুক্ত সদস্য হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের স্বউদ্যোগে প্রধানমন্ত্রিত্বের পরিচয় কারোরই মনঃপূত হয়নি।

৮ এপ্রিল দিলিল্গ থেকে তাজউদ্দীন আহমদ কোলকাতায় ফিরলে ভবানীপুর এলাকার রাজেন্দ্র রোডের এক বাড়িতে তাকে ছেঁকে ধরা হয়। বলতে গেলে ওই বৈঠকে আপত্তি, অভিযোগ এবং পারস্পরিক অবস্থানের টানাটানির ভেতরেই পরিসমাপ্তি ঘটে। রাতে এম মনসুর আলী আনুপূর্বিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে বললেন, তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক আচরণ ও নৈতিকতা সঠিক হয়নি। তবুও বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীরূপে তাজউদ্দীনকে মেনে নেওয়া ব্যতীত গত্যন্তর নেই। সেদিন পাশাপাশি একত্রে একটি কক্ষে অবস্থানকালে জননেতা হিসেবে মনসুর আলীর যে ধীশক্তি, অস্থিরতাহীন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নৈর্ব্যক্তিক ক্ষমতা দেখেছি, তা সেই সময়ে বিরাজমান সরকার গঠনের জটিলতা নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সরকার গঠনে খন্দকার মোশতাক বিশেষ জটিলতার সৃষ্টি করেন। প্রধানমন্ত্রী না হতে পেরে তিনি মন্ত্রিপরিষদে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, 'আমাকে ওমরাহ হজ পালনের জন্য মক্কা পাঠান।' মনসুর ভাইয়ের কাছে শুনেছি, তাজউদ্দীন সাহেব রাগান্বিত হয়ে পরিষ্কার বলে দিলেন, দরকার হলে মোশতাককে বাদ দিয়ে সরকার চলবে। মোশতাককে মনসুর সাহেব বলেন, জাতির এই দুর্দিনে এবং বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ নিয়ে কালক্ষেপণ করা ঠিক হবে না। ৯ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ গঠন সংক্রান্ত যে সিদ্ধান্ত হয় এবং স্বাধীনতার সনদপত্রের যে খসড়া হয়েছে সেই অনুসারে মন্ত্রিপরিষদ গঠনের বিষয়টি সবাইকে মেনে নিতে হবে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম মনসুর আলী সাহেবকে সমর্থন করেন। সরকার গঠন এবং কী ধরনের সরকার হবে, তাই নিয়ে ত্রিভুজ বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থা নিরসনে মনসুর ভাই এএইচএম কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করেন। হেনা ভাই মনসুর আলীর কথায় সম্মত হন। মনসুর আলী দেখতে পেলেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা সরকার গঠন না করে শেখ ফজলুল হক মনির নেতৃত্বে যুবনেতারা বিপ্লবী কাউন্সিল গঠনের পক্ষে। একই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ভেতরে বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল গঠনের জন্য মেজর জিয়াউর রহমান তৎপর। সে জন্য তড়িৎ গতিতে সরকার গঠন করা ছিল অপরিহার্য। এ বিষয়ে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন মনসুর আলী।

১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে। এম মনসুর আলী অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দেন এবং দেশ স্বাধীন হলে তড়িৎ গতিতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে ক্ষতিসাধিত হয়েছে বা হবে, তা পূরণের জন্য বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এক বেতার ভাষণে তিনি বলেন, 'বাঙালি জাতির ইতিহাসে আজ এক চরম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হতে চলেছে। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে যারা পশু বলে বঞ্চিত করতে চাইছে, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো আপস নেই। অস্ত্র প্রয়োগে স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম স্তব্ধ করা যায় না। বাঙালির এ মুক্তি সংগ্রামকেও তাই বুলেট, বেয়নেট, শেলগোলায় স্তব্ধ করা যাবে না। রক্তে যখন মাতম জেগেছে, পদ্মা-মেঘনায় বান ডেকেছে, তখন তাকে রক্তক্ষতে পারে এমন সাধ্যি কারও নেই।'

শহীদ এম মনসুর আলী ছিলেন তীক্ষ্ণষ্টধী, অমায়িক এবং মানবকল্যাণে এক নিবেদিত রাজনীতিবিদ। সমগ্র জীবন সাধনায় ছিল মানবকল্যাণে। তিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবন ও মরণের সঙ্গী। বঙ্গবন্ধু দুঃখী মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের (বাকশাল) কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এম মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী হলেন। জেলা গভর্নরদের প্রশিক্ষণ বক্তৃতায় তিনি বলেন, 'পৃথিবীর বড় বড় ইতিহাস দুঃসাহসিক সৃষ্টি। বিশ্বের ইতিহাসে যেসব নেতা জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন, বঙ্গবন্ধু তাদের অন্যতম। সাধারণ পন্থায় যা সম্ভব নয়, তা অসাধারণ পন্থায় করাই বিপ্লব। বিপ্লবের বিশেষ ধর্ম আছে, পথ আছে। সেই পথে বিপ্লবকে অগ্রসর হতে দিতে হবে, মাঝপথে ছেড়ে দিলে চলবে না, গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে হবে।'

জাতির পিতাকে হত্যা করে এম মনসুর আলীকে খুনি মোশতাক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি তীব্র ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন। জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে তিনি ছিলেন আপসহীন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও জীবনাদর্শের বিপরীতে আপসহীনতায় কৃষ্ণছায়ায় বেঁচে থাকার সুযোগ গ্রহণ করেননি। বঙ্গবন্ধুর যথার্থ সহচর হিসেবে জীবনে ও মরণে ছিলেন তার অনুগামী। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খুনি মোশতাক চক্র ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও এম কামারুজ্জামানের সঙ্গে তাকে গুলি করে ও বেয়নেটে খুঁচিয়ে হত্যা করে। আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করে তিনি হয়ে আছেন এক মৃত্যুঞ্জয়ী মহাপুরুষ। জন্মশতবর্ষে তার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।